Wednesday, October 22, 2014

চার ঝুঁকিতে অর্থনীতি

চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে নিকট-ভবিষ্যতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চারটি বড় ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করে এ দাতা সংস্থাটি।

প্রথমত, যদি আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি মন্থর হবে। এটি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভকে চাপে ফেলবে। দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাক খাতের কর্মপরিবেশের ঘাটতি থাকলে ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারানোর শঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার আবারও উন্মুক্ত না হওয়া এবং চতুর্থত, রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ব্যাংকের সক্ষমতার ঘাটতি আর্থিক খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট ২০১৪’ প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এ উপলক্ষে ঢাকার বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ও গবেষক নাদিম রিজওয়ান।

চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে জিডিপির ৩৪-৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে জিডিপির ২৮ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে। এক বছরের মধ্যে তা ৩৪ শতাংশে উন্নীত করা বা ৫-৬ শতাংশ বিনিয়োগ বাড়ানোর নজির কোনো দেশের নেই। তাঁর মতে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তৈরি পোশাক খাতের চলমান সংস্কারের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্বৈত রেলপথ, পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের জন্য পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় হার এখন জিডিপির ৩০ শতাংশ, যা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ হারের চেয়ে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

এর ব্যাখ্যা করে জাহিদ হোসেন বলেন, বিনিয়োগ করার মতো অর্থ রয়েছে। পরিবেশ তৈরি হলে বিনিয়োগ হবে। রাস্তাঘাট, গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দর সুবিধাসহ অবকাঠামো তৈরি করা হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে।

চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে—এ পূর্বাভাসের কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারি বিনিয়োগের ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে। স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আগের চেয়ে কিছুটা চাঙা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধি এবং প্রবাসী-আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ভোক্তার চাহিদা বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে সেবা ও শিল্প খাতে আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। শিল্প খাতে সাড়ে ৯ শতাংশ ও সেবা খাতে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। তবে কৃষি খাতে আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২ শতাংশ হতে পারে।

ব্যয় খাত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোক্তা ব্যয়, বিনিয়োগ ও আমদানি ব্যয়—এ তিনটি খাতে গত অর্থবছরের চেয়ে চলতি বছরে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে। তবে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি কমবে। গত অর্থবছরে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ৬ শতাংশ হতে পারে। তৈরি পোশাক খাতের সুসংহত অবস্থান চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, তুলনামূলকভাবে কম মজুরির কারণেই তৈরি পোশাক খাতটি সুসংহত অবস্থান ধরে রাখবে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীল সরবরাহের ব্যবস্থার কারণে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হতে পারে। এ বছর গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই রয়েছে। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী ইবোলা ভাইরাস প্রতিরোধে ৪০ কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। তবে বাংলাদেশের এ মুহূর্তে এ সহায়তা দরকার নেই।

 আর্থিক খাত: বাংলাদেশের ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সন্তোষজনক নয় বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ব্যাংক খাতে এক-চতুর্থাংশ সম্পদের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর দুর্বল মূলধন ভিত্তির কারণে এ খাতটি ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনটি কারণে ব্যাংক খাতের অবনিত হয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এগুলো হলো—রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঋণ প্রদানে দুর্বল সিদ্ধান্তের প্রতিফলন এবং খেলাপি ঋণের মানদণ্ড পরিবর্তন। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৪ সালে শেয়ারবাজার কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

 দারিদ্র্য: বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে এসে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। এটি বিশ্বব্যাংকের অনুমান। তবে এ অনুমান তথ্যভিত্তিক বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

দারিদ্র্য কমার কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশের বেশি অর্জিত হয়েছে। কৃষি খাতের গড় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়া প্রবাস-আয়েও গড় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব কারণে গত দশকে (২০০০—২০১০) বার্ষিক ১ দশমিক ৭৪ শতাংশীয় পয়েন্টে যে দারিদ্র্য কমেছে, তা এ দশকেও অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরের মধ্যে দেশে ৪৬ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের ঘাটতি পূরণ করেছে প্রবাসে জনশক্তি রপ্তানি করে। কৃষি খাতেও মজুরি বেড়েছে।

Source: অর্থনীতিতে চার ঝুঁকি

No comments:

Post a Comment